গত এক সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের। প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা ও হাহাকার দেখা দিয়েছে।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও কৃষকরা তা ছাড়িয়ে আরও বেশি জমিতে আবাদ করেন। ধান পাকতে শুরু করায় কৃষকদের মধ্যে স্বপ্ন জাগলেও আকস্মিক বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও উজানের পানিতে জেলার নদ-নদীর পানি বেড়ে গিয়ে হাওর ও বিল এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৪৭৮ হেক্টর।
তবে গত তিনদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করেছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত না হলে নিমজ্জিত কিছু ধান আংশিক উদ্ধার করা সম্ভব।
এদিকে হাওরপাড়ের কৃষকরা চরম সংকটে পড়েছেন। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান অনেক ক্ষেত্রে হাঁসের খাবারে পরিণত হচ্ছে। বাজারে ধানের দামও কমে গিয়ে প্রতিমণ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম।
স্থানীয় কৃষক আরিফ তালুকদার জানান, পানির নিচে থাকা ধান কাটতে প্রতি কাঠায় শ্রমিক খরচ হচ্ছে প্রায় ১৮০০ টাকা। ধান বাড়িতে আনতে নৌকা ভাড়া বাবদ আরও ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এতে প্রতি কাঠা জমির ধান কাটতে মোট খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৮০০ থেকে ৩০০০ টাকা, যা অধিকাংশ কৃষকের পক্ষে বহন করা কঠিন।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, রোববার বিকেল পর্যন্ত উব্দাখালী, কংশ ও ধনু নদীর পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এক সপ্তাহের মধ্যে বাকি ধান কাটা শেষ করা সম্ভব। তবে জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, ফলে শ্রমিকদের কাঁচি দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সারা বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে নেত্রকোনার কৃষকরা এখন বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।